ডেস্ক নিউজ : রোজা শুরুর সপ্তাহ খানেক আগে থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে লেবুর দাম। এক পর্যায়ে মাঝারি আকারের প্রতিটি লেবুর দর ৩০ টাকার ঘর স্পর্শ করে। তবে ১০ থেকে ১২ দিন পর দাম কমতে শুরু করেছে। মাঝের এই সময়ে কেন লেবুর দাম এত বেশি বাড়ল- এর কারণ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
ইফতারে কমবেশি সবাই শরবত পান করেন। এই শরবত তৈরির মূল উপাদান লেবু। রোজার আগে এর চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। যার সুযোগ নেন মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। প্রতি বছর রমজানকে কেন্দ্র করে লেবুর চাহিদা ও যোগানে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, এবারও তার প্রতিফলন দেখা গেছে। রোজার শুরুতে অস্বাভাবিক উত্থান ঘটেছে লেবুর বাজারে।
দামের চিত্র দেখার জন্য সপ্তাহ দুয়েক আগের লেবুর বাজারে ফিরে যাওয়া যাক। গত ৬ ফেব্রুয়ারি মাঝারি আকারের প্রতি হালি লেবুর দর ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি পিস লেবুর দর ছিল ১০ থেকে ১২ টাকা। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের দিন অর্থাৎ গত ১৩ ফেব্রুয়ারি লেবুর বাজার রীতিমত উত্তপ্ত হয়ে উঠে। তখন মাঝারি আকারের প্রতি হালি বিক্রি হয়েছিল ১১০ থেকে ১২০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি পিস লেবুর দর ছিল ২৮ থেকে ৩০ টাকা। গত সপ্তাহ জুড়ে প্রায় এরকমই ছিল দাম।
এভাবে দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে নানা কারণ দেখিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। তাদের যুক্তি ছিল- এখন লেবুর ভরা মৌসুম নয়। গাছে নতুন ফুল ও ছোট ফল আসায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। সেজন্য দাম বেড়েছে। এক-দেড় মাস পর পুরোদমে লেবু আসা শুরু হবে। তখন দাম কমে যাবে।
তবে গত এক সপ্তাহ রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ফলের পাশাপাশি লেবুর দোকানগুলোতেও ক্রেতার বেশ চাপ ছিল। তখন কয়েকজন ক্রেতা সমকালকে জানিয়েছিলেন, চার-পাঁচ দিন পর রোজা শুরু হবে। রোজা রেখে বাজার করা কষ্টকর। সেজন্য আগেভাগে একসঙ্গে কিনে রাখছেন। দামের বিষয়ে তাদের অভিযোগ ছিল, চাহিদাকে পুঁজি করে আড়তদার ও ফড়িয়ারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এবার আসা যাক শনিবারের বাজারে। এদিন বেশ ছন্দপতন দেখা গেছে লেবুর দামে। বাজারে লেবুর সরবরাহ দেখা গেছে পর্যাপ্ত। মাঝারি আকারের লেবুর হালি বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। এটি গত তিন-চার দিনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দাম। ছোট আকারের লেবুর বিক্রি হয়েছে আরও কম দামে। প্রতি হালি বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে। অর্থাৎ লেবুর এই দর ফের দুই সপ্তাহ আগের দরের কাছাকাছি দামে ফিরেছে।
এখন দর কমছে কেন- এ বিষয়ে কারওয়ান বাজারে তিনজন খুচরা ও দুই পাইকারি ব্যবসায়ী, নাখালপাড়া ও মহাখালি কাঁচাবাজারের তিনজন খুচরা ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়। তাদের প্রায় সবাই বলেছেন, গত কয়েকদিন এক হালি লেবু কিনছেন- এমন ক্রেতা একশ’র মধ্যে দুই-তিনজন পেয়েছেন। প্রায় সব ক্রেতাই ডজন হিসেবে লেবু কিনেছেন। কেউ কেউ দুই-তিন ডজন করে কিনেছেন। কিন্তু এখন ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে, বিক্রির পরিমাণও কমেছে। যা দর কমাতে ভূমিকা রাখছে।
নাখালপাড়া এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান সমকালকে বলেন, গত কয়েকদিন পাইকারি বাজারে দাম বেশি ছিল। এ কারণে তাকেও বেশি দরে বিক্রি করতে হয়েছে।
কারওয়ান বাজারে ৩৫ বছর ধরে লেবুর পাইকারি ব্যবসা করছেন জাহাঙ্গির আলম। সমকালকে তিনি বলেন, রোজায় দাম ভালো পাওয়া যাবে-এই আশায় চাষীরা রোজার আগে গাছ থেকে লেবু সংগ্রহ বন্ধ রেখেছেন। ফলে লেবুর সরবরাহ কমে গেছে। সেজন্য দাম বেড়েছিল।
আলম মিয়া নামের ষাটোর্ধ্ব আরেক ব্যবসায়ী জানান, গত এক সপ্তাহে যারা দুই-তিন ডজন করে লেবু কিনেছেন সেগুলো তাদের বাসায় এখনও আছে। তার ভাষ্য, শুধু ব্যবসায়ীকে দোষ দেওয়া চলবে না। ক্রেতারা একসঙ্গে কেন এত বেশি কিনবেন? একসঙ্গে যখন অনেক ক্রেতা আসে, পরিমাণে বেশি কিনেন তখন তারা দর কষাকষিও করেন না। কিছু ব্যবসায়ী সেই সুযোগটি নেন। এটাই স্বাভাবিক।
এ ব্যাপারে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান সমকালকে বলেন, রোজার সময় দাম বাড়বে বা সংকট তৈরি হবে- এই আতঙ্ক থেকেই ভোক্তারা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কিনেন। যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ও দাম বাড়ায়। বাস্তবে দেখা যায়, উৎপাদন বা আমদানিতে সমস্যা না থাকলেও হঠাৎ অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে যায়। এতে পাইকারি ও খুচরা বাজারে চাপ তৈরি হয়, যা ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, ভোক্তার উচিত প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে কেনাকাটা করা। কয়েকদিন পরপর প্রয়োজনীয় পণ্য কিনলে বাজারে চাহিদার ভারসাম্য বজায় থাকে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক থাকে এবং অযথা মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমে যায়।
এআরওকে
Leave a Reply